শাশ্বত কর
![]() |
‘ফিরব বললে ফেরা যায় নাকি?’- মহীনের ঘোড়াগুলির
প্রায় প্রবাদ হয়ে যাওয়া গানের চরণের উত্তর খানিক হলেও মিলে যায় পৃথা চক্রবর্তীর নতুন
ছবি ফেরায়।
সাধারণ মানুষের সাধারণ গল্প। মার প্যাঁচ,
প্যাঁচ পয়জার- গল্প থেকে স্ক্রিপ্ট, অভিনয় থেকে ক্যামেরা- কিচ্ছু নেই। আছে কেবল সাধারণ
মানুষের সাধারণ কথাবার্তা। ‘অবশ্য কে রাখে খবর তার!’
তবে কি না শুনেছি বিদ্বানেরা বলেন, অতি সাধারণের
মধ্যেই নাকি আবার অসাধারণের ইশারা লুকিয়ে থাকে। তা চেনা সবার কম্ম না, সেই অসাধারণের
বীজটিকে বৃক্ষ করে তোলার কাজও সব সাধারণের না। যদি তাই হয় তবে বলতেই হবে এই ছবির কলাকুশলীরা
সাধারণের খবরাখবর রাখেন, না হলে এমন মাটি ছোঁওয়া প্রাণবন্ত অভিনয় কেবল প্রতিভা থেকে
উঠে আসে না। ছবির ক্রুরাও অবশ্যই খবর রাখেন সাধারণের, নইলে এমন স্ক্রিপ্ট, এমন লোকেশন,
এমন গল্প বলা, এমন আলো আর এমন গান- এমন পরিচালনা হয়ে ওঠে না।
‘ফেরা’ আসলে আমার আপনার মনোজগতে একবারটি ফেরার
টিকিট। বাবার কাঁধে আর একবার মাথা রাখবার অবসর। মায়ের গায়ে গা ঠেকিয়ে খালি হয়ে যাওয়ার
সুযোগ। মা বাবা থাকলে তো বটেই, তাঁরা যদি এখন ইহলোকে নাও থাকেন তবুও মনের ঘরের কবাট
খুলে তাঁদের পাশটিতে বসার, একবার কেঁদে মনটাকে ধুয়ে নেওয়ার আড়াই ঘন্টার স্লট।
আশিস বিদ্যার্থীর একটা পডকাস্টে একবার শুনেছিলাম
মায়ের কথা। ওঁর বলার ধরণ অনায়াসে মনের অর্গল খুলে দিয়েছিল। স্বভাবসিদ্ধ ঢঙে বলছিলেন
আমাদের নানান ব্যস্ততার মাঝে হঠাৎ করে বেজে ওঠা ফোনে ভেসে ওঠা মায়ের কথা। আমরা কখনও
বিব্রত, কখনও বিরক্ত। খেয়েছিস নাকি, কাজের লোক এসেছিল নাকি, জানালা আটকেছিস নাকি- খুঁটিনাটি
অবান্তর জিজ্ঞাসা! রিমোট কাজ করছে না, জলের মেশিনে আলো ব্লিঙ্ক করছে না, মাসির পেট
ব্যথা, কাঠবেড়ালির বাচ্চা হওয়া- কত সব অপ্রয়োজনীয় প্রসঙ্গের অবতারণা। অথচ তখন হয় তো
মিটিং চলছে, না হয় বসের বকুনি চলছে, না হোক কোনো আমিউজমেন্টই বা চলছে- ছেলে মেয়ে হলে
কি সেটুকুও করা যাবে না! ফোন কেটে দিই কখনও বা আমরা, কখনও বা পরে করব বলে রেখে দিই।
তারপর ভুলে যাই গতির তাড়নায়। দোষ নেই আমাদের- এক দৃশ্যের সামনে দাঁড়িয়ে অন্য দিকে কী
ঘটছে সব সময় তো সবাই বুঝতে পারি না অথবা বোঝার অবকাশ থাকে না- তাই না?
এই ছবিটা কিন্তু সেই অবকাশ দেয়। একেবারে পাশাপাশি
বাবার ফোন আর ছেলের বিজি শিডিউলের দ্বন্দ্ব পাশাপাশি দাঁড়ায়। কী করবে ছেলে মেয়েরা এবার?
কতদূর করবে? ঠিক যেমন পিকুতে একেবারে পাশাপাশি দাঁড়িয়ে ছিল অমিতাভ বচ্চন, দীপিকা পাড়ুকোন
আর ইরফান খানের ম্যাজিক।
তা ম্যাজিক এক অর্থে এই ছবিতেও আছে। নইলে
এই আকালের দিনেও চতুর্থ সপ্তাহ রানিং, তবুও ব্যস্ত সমস্ত শহরের এক্কেবারে বুকে ম্যাটিনি
শো প্রায় হাউসফুল হয়? সত্যি। গতকাল নন্দনে গেছিলাম পড়ন্ত দুপুরে। ইয়া লাইন। সেই দেখে
টিকিট কেটে ঢুকেও পড়েছিলাম। বাংলা ছবি- তায় গুপ্তধনহীন, রহস্য রোমাঞ্চহীন, আইটেম গানহীন,
ধুমধড়াক্কা ভায়োলেন্সহীন- কেবল সাধারণ মানুষের সাধারণ সব গল্পকথা দেখতে এই ভিড়- সত্যি
ম্যাজিকাল!
রীতিমত ম্যাজিক করেছেন সঞ্জয় মিশ্র, ঋত্বিক
চক্রবর্তী আর সোহিনী সরকার। পরিচালক পৃথা আসলে দু’দিক থেকেই দেখতে জানেন। কর্পোরেট
জীবন দেখতে জানেন। সঙ্গীহীন একা বৃদ্ধের অভিমান , জেদ, ভালোবাসা, স্নেহ, জড়তা দেখতে
জানেন। তেমনই স্বপ্নপাহাড়ের দৌড়বাজ আরোহীদের দেখতে জানেন, তাদের লুকোনো কান্না দেখতে
জানেন, ক্ষোভ , প্রক্ষোভ, ভালোবাসা, বিচ্ছেদ দেখতে জানেন। সমাজটাকে সেই সময়ে রেখেই
সমাজের বাইরে থেকে দেখতে জানেন।
প্রশ্ন হলো, দেখতে তো জানেন, অন্যকে ঠিক সেই
ভাবে দেখাতে জানেন কি? এক্ষেত্রে আমার উত্তর হলো- হ্যাঁ। শুধু জানেন না, মুন্সিয়ানার
সাথে টুকরো টুকরো কান্না হাসি স্বপ্নগুলো আমার মতো সাধারণ দর্শকদের দেখাতে জানেন।
গল্প কিন্তু সত্যিই অতি সাধারণ। ঝাড়গ্রামের
কালিন্দিপুর। সেখানকার বৃদ্ধ ফুটবল কোচ পান্নালাল। স্বপ্ন, আদর্শ, স্পোর্টসম্যান স্পিরিট,
ভালোবাসা আর জীবনের ঠোক্কর খাওয়া বৃদ্ধ পান্নালাল- গ্রামের আবালবৃদ্ধ বনিতার পল্টুদা।
পল্টুদার বাড়িটাও তাঁর মতোই। প্লাস্টার ঝরঝরিয়ে ঝরঝরিয়ে শুধু খসে খসে যায়! এই বাড়ি
সারানো আর ফুটবল টুর্নামেন্টের টাকা জোটানোর তাগিদে পল্টুদা কলকাতায় ছেলের কাছে আসেন।
এমন সাধারণ বাড়ির ছেলেরা কতদূর অসাধারণ হয়? প্ল্যান করে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখা ভালো
ছেলে পল্টুদার। নাম পলাশ। বাবা ছেলে – তাদের স্বপ্ন আর চাওয়া পাওয়া, তাদের দূরত্ব আর
কাছে আসা, মধ্যিখানে ফ্ল্যাট মালকিন স্নিগ্ধা-
এক অপূর্ব চেনাজানা মায়াছবি এঁকেছেন পরিচালিকা। গল্পের বুনটে আর অভিনয়ের অনবদ্য মুন্সিয়ানায়
ফুটে উঠেছেন পান্নালালের বন্ধু, পলাশের সহকর্মীরা, আর প্রবাসী ছেলে মেয়ের বৃদ্ধ বাবা
মায়ের ইঞ্জেকশান টু পাশবুক আপডেটের মুশকিল আসান পলাশের আনন্দদা। ফিরতে চাইলে যে ফেরা
যায় আবার পাশাপাশি সবসময় যে অনেক চাইলেও আর ফেরা যায় না- দুই ছবিই সযত্নে সাজিয়ে দিয়েছেন
পরিচালিকা। আর এখানেই ছবিটার বিশেষত্ব।
কেবল টানাপোড়েন দ্বিধাদ্বন্দ্ব না, রসবোধ
কিন্তু ছবির অনেকটা জুড়ে। সে পান্নালালের সাথে তাঁর বন্ধুর কথোপকথনেই হোক, কুকুর কলাবতীর
কার্যকলাপ ঘিরেই হোক, মাঝরাতে ছেলের নজর এড়িয়ে ছেলের শু র্যাকে লুকিয়ে রাখা বোতল থেকে
একটু ঢুকুঢুকুই হোক , রোববারে বাপ ছেলের লুচিভাজাই হোক অথবা আনন্দদা আর পলাশের অফিস
ফেরতা ছাদ মিটিং এ ‘দু একটা ফাইল সাইন’ করতে চাওয়া পল্টুদাই হোক- মজা কিন্তু একেবারে
সাধারণ জীবনের মতো লুকিয়ে আছে ছবিটায়, কেবল
খুঁজে নিতে হবে দর্শককে।
ছবির গল্প বলা আমার ধাতে নেই। চুলচেরা বিশ্লেষণ-
সেও ক্ষমতায় নেই। বরং বলি- সঞ্জয় মিশ্র, ঋত্বিক চক্রবর্তী আর সোহিনী সরকারের চরিত্রের
খুব চেনা, প্রেডিক্টেবল অথচ অনবদ্য রসায়ন আর চেনা জানা অথচ ম্যাজিকাল ক্লাইম্যাক্সটুকু
দেখার জন্য এ ছবিটায় বারবার ফেরা যায়।
এবার ফিরি এ লেখার শিরোনামে। গতকাল ছবির শেষে
উপস্থিত ছিলেন পরিচালিকা স্বয়ং। দর্শকদের সাথে ইন্টার্যাক্টিভ সেশানটায় অনেকেই আবেগ
তাড়িত হয়ে পড়লেন! গলা বুজে আসতেও দেখলাম কারও কারও! দর্শকদের এই সমবেত অভিনন্দন আর
ভালোবাসা কুড়িয়ে নিয়ে পরিচালিকা দুটি আবেদন রাখলেন-
এক. প্রেক্ষাগৃহ থেকে বেরিয়ে যদি পারা যায়
একবার বাড়ি গিয়ে মা , বাবার কাছে যাওয়া। না হলে অন্তত ফোন করে কথা বলা- ফেরার পথটাকে
তৈরি করে রাখা।
দুই. আজ পিতৃদিবস। যদি সম্ভব হয় বাবা ছেলের
এই ফেরার কাহিনি একবার পারলে দেখে আসার কথা বলা পরিচিতদের।
কাজেই এবার আমার বলার পালা। দেখে আসুন বন্ধু।
সঞ্জয় মিশ্রর ভক্তকুল দেখে আসুন। ডেভিড ধাওয়ান থেকে কুরোশাওয়া, স্বপন গুহ থেকে ঋত্বিক
ঘটক- সবার দর্শকের কাছেই বলার- গরিমা, অহং, হীনমন্যতা, ব্যস্ততা, অভিমান- সব কিছু আলগোছে
তাকে তুলে শেকড়ের কাছে ফেরার জন্য একবার ‘ফেরা’ দেখে আসুন।
দর্শক দরবারে পরিচালক
ফেরা
পরিচালকঃ পৃথা চক্রবর্তী
অভিনয়ঃ সঞ্জয় মিশ্র, ঋত্বিক চক্রবর্তী, প্রদীপ
ভট্টাচার্য, সোহিনী সরকার, প্রিয়াঙ্কা সরকার, সুব্রত দত্ত
সঙ্গীত- রনজয় ভট্টাচার্জি
সম্পাদনা- শুভজিৎ সিংহ

Comments
Post a Comment